English সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২০

জাতীয় নিরাপত্তাকে অবশ্যই রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে হবে

EDITOR’S CHOICE-ENG-19-06-2020-2

আমার মূল্যায়ন অনুযায়ী, পূর্ব লাদাখের গালওয়ান রিভার, হট স্প্রিংস, প্যাংগং সো ও নর্থ সিকিমের নাকুর এলএসিজুড়ে চীনা অনুপ্রবেশগুলোর মাধ্যমে সর্বশেষ জাতীয় নিরাপত্তা সঙ্কট সাত সপ্তাহ ধরে চলছে। পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে তিনটি রুটিন বিবৃতি দিয়েছে। এলএসিজুড়ে চীনা আগ্রাসনবিষয়ক সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠাতিক বিবৃতি দেয়া হয়নি। অবশ্য ১৩ জুন সেনাপ্রধান সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলার সময় জানিয়েছেন, আমরা ধাপে ধাপে অপসারণ করছি। আমরা গালওয়ান নদী উপত্যকা থেকে সরে আসা শুরু করেছি। এখানেই সবচেয়ে বেশি সরে আসার কাজ হয়েছে।

মিডিয়ায় ‘বিশ্বাসযোগ্য সরকারি/সামরিক সূত্রের’ উদ্ধৃতি দিয়ে খবর পরিবেশন করছে। অনুপ্রবেশের খবর প্রকাশ পেয়েছে মুষ্টিমেয় কয়েকজন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও সাংবাদিকের কারণে। সৈনিক সাংবাদিকেরা সাহসিকতার সাথে তথ্য ফাঁস করেছেন।

গত সাত বছর ধরে (ডেপসাং ২০১৩, চুমার ২০১৪, দোকলাম ২০১৭ ও এখন ইস্টার্ন লাদাখ ২০২০) অচিহ্নিত এলএসি ও সদা পরিবর্তনশীল চীনা দাবির কারণে একই ধরনের জাতীয় সঙ্কটে পড়েছি। চীনা পদক্ষেপ প্রতিবারই আমাদের বিস্মিত করে। আর আবার অনেক বেশি শক্তি দিয়ে ঘটনার পরে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি, অনুপ্রবেশের সঠিক স্থান ও মাত্রা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয় না। সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার ফলাফল কখনো জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয় না, এবং ভিন্নমত দেখা দেয়। পরের সঙ্কটের সময় আমরা আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করি।

এ ধরনের সঙ্কটে সরকারের প্রাথমিক উদ্বেগ হলো, সম্ভাব্য ভূখণ্ড হারানোর ইঙ্গিত দেয়া মানে দেশীয় রাজনীতিতে পরাজয়। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা যখন ক্ষমতায় থাকা কোনো দলের মূল আদর্শগত মূল্যবোধ হয়, তখন তা আরো বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ‘ভিন্ন ধারণা’র যুক্তি অস্বীকার করা বা চেপে যাওয়া বা আড়াল করার ফলে কার্যত চীনা অবস্থানকেই স্বীকৃতি দেয়া হয়। এর মাধ্যমে স্বীকার করে নেয়া হয় যে পিএলএ তার নিজের এলাকায় কাজ করছে এবং ভারত তার টহলের মাধ্যমে তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করছে।

চীনকে উস্কানিদাতা ও আগ্রাসী হিসেবে তুলে ধরার বদলে আমরা জনসাধারণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্ব্যর্থবোধক বার্তা দেই। এটি আমাদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে জাতিকে বিভ্রান্তও করে। বাস্তবতা হলো সামরিক বাহিনীর সামর্থ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকাটা চীনকে আনুকূল্য প্রদান করে। আমরা দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনা শুরু করি এবং পরিণতিতে যে ছাড় দেই তা আরো বড় উদ্বেগ সৃষ্টি করে। 

সব নিরাপত্তা পরিকল্পনার সূচনা বিন্দু হলো জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল। কারণ হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধির বিষয়টি এর সাথে যুক্ত। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভারতের কোনো সরকারই স্পষ্ট জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করেনি। গত যুদ্ধের আলোকেই তারা পরিকল্পনা করে, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে নয়। ২০১৮ সাল থেকে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নের জন্য প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা কমিটিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়েছে সামান্যই।

এখন আমরা আমাদের দরজার সামনে শত্রুর মুখোমুখি হয়েছি। এই শত্রু গত তিন দশক ধরে যৌক্তিক নীতিমালা গ্রহণ করেছে জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে এবং তাদের সামরিক বাহিনীকে রূপান্তরিত করেছে, নীতির আলোকে তাদেরকে প্রস্তুত করেছে। তারা বর্তমান সীমান্ত ঘটনাগুলো ঘটানো শুরু করেছে ভারতের বিরুদ্ধে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য। তারা তাদের শর্তের আলোকে স্থিতাবস্থা সৃষ্টির জন্য সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ করছে।

এলএসিতে সহিংসতার কারণে এখন বর্তমান সঙ্কট নিরসনে সরকারকে তার নীতি পর্যালোচনা করতে হবে। ভূখণ্ড হারানো ছাড়াই সঙ্কটটি সমাধান করতে হবে, আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মর্যাদা হারানো যাবে না। এ কারণে প্রথমেই দেশের রাজনীতি থেকে জাতীয় নিরাপত্তাকে আলাদা করতে হবে। এটি সরকারের দায়িত্ব।

সরকারকে অবশ্যই বিরোধী দল, পার্লামেন্ট, মিডিয়া ও জনসাধারণকে আস্থায় নিতে হবে, জানার প্রয়োজন নীতির আলোকে নিরাপত্তা নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে হবে যাতে জাতি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। পিএলএকে রুখে দেয়ার সক্ষমতা আমাদের সামরিক বাহিনীর আছে। আর তাতেই পরাজয় হবে চীনের।

 

(লেখক: অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল, জিওসি-ইন-সি, নর্দার্ন কমান্ড)